
আমার এক বন্ধু কাল সন্ধ্যায় ফোন দিয়ে খুব উত্তেজিতভাবে পিনাক রঞ্জনের উক্তি নিয়ে তার উষ্মা প্রকাশ করলো। তার ধারণা হাইকমিশনারের গুরুতর কোনো সমস্যা হয়েছে। তিনি হঠাৎ করে ব্যালান্স হারিয়ে ফেলেছেন। আমি তাকে তখনই কোনো আশ্বাসের বাণী শোনাতে পারলাম না। সে হতাশা ক্ষোভ আর প্রতিবাদে জ্বলছিল। কয়েকদিন আগে ভারত ঘুরে এসেছে। ভোররাত থেকে ভিসার লাইনে দাঁড়িয়ে ভিসা সংগ্রহ করেছে। দূতাবাসের লোকদের খারাপ আচরণ সয়েছে। আমি তাকে বললাম, আমি এখনও খবরটা দেখিনি। দেখি আগে। রাতে টিভিতে হাইকমিশনারের উক্তির জায়গাটা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে শুনলাম, দেখলাম। দেখলাম, কথা বলার সময় তিনি উত্তেজিত ছিলেন না। ভাবলেশহীন মুখে তিনি তার বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, প্রতিবছর ২৫ হাজার বাংলাদেশী ভারতে ভিসা নিয়ে গিয়ে আর ফিরে আসে না। তারা ভারতে গিয়ে কী করছে কোথায় আছে সে সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না। আর তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, যারা ভারতীয় দূতাবাসে ভিসার জন্য দাঁড়ায় তাদের ৮০% দালাল ও টাউট। ভারতীয় দূতাবাসে যারা ভিসার জন্য যান তাদের প্রতি এই অবমাননাকর বক্তব্যে বাংলাদেশের অনেক মানুষ রুষ্ট হয়েছেন। কারণ সবাই জানে, যারা ভিসা আনতে যান তাদের ৮০% (কম/বেশি) চিকিৎসার জন্য ভারত গমনে ইচ্ছুক। এই সব আর্ত মানুষ ও তাদের আত্মীয় স্বজন টাউট বা দালাল নয়। দালালরা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় থাকে। থাকে দূতাবাসের ছত্রছায়ায়। ভারতীয় দালাল বলে বহুল প্রচলিত শব্দ নিশ্চয়ই পিনাক রঞ্জনকে একথা বলতে উৎসাহিত করে থাকবে। কিন্তু এই মানুষগুলো ভারতীয় দালাল বা টাউট নয়, একথা স্পষ্ট করে বলা দরকার। টাউট এদেশের মানুষ নয়, টাউট দূতাবাসের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু মানুষ। যাদের সংখ্যা ৮০% কখনোই হতে পারে না।
আর যদি বৈধ ভিসা নিয়ে ২৫ হাজার মানুষের ভারতে থেকে যাবার কথা সত্য হয় তবে ভারতে প্রতি চারবছরে এক লাখ মানুষ আবাস গাঁড়ছে। এটা তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমস্যা। ভারতের মতো একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড যেখানে সহস্র বিদ্রোহ দিকে দিকে ঘনিয়ে উঠছে সেখানে বৈধ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশীরা আবাস গাঁড়ছে এমন প্রমাণ থাকলে ভারতের উচিত সে প্রমাণ দিয়ে বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠানো। নইলে মিথ্যা কথা বলার দায়ে তাদের হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করা উচিত।
পিনাকের বক্তব্য বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কারণ মানুষ ইতিমধ্যে তথাকথিত পানি বিশেষজ্ঞ বলার মধ্য দিয়ে তার অবজ্ঞার কথা জেনে গিয়েছে। এবার তার মধ্যে যা দেখা গেল তার হলো একটি জাতির প্রতি ঘৃণা, অসম্মান ও বিদ্বেষ। তার কথার মধ্যে কিছুটা সত্য থাকতে পারে। কিন্তু তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এটি বিদ্বেষ হিসেবেই পঠিত হবে।
বলছিলাম, ব্ক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নির্লিপ্ত। লোকে বলছে, পিনাকের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এরকম সময়ে কেন তিনি বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন? তার তিনি যদি ঠাণ্ডা মাথায় ক্ষেপিয়ে থাকেন তাহলে তার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? হতে পারে, তিনি তার মেয়াদকালে তার অভীষ্টে পৌঁছাতে পারেন নাই। বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছ থেকে তার যা আদায় করার কথা ছিল তা অর্জিত হয় নাই। ফলে তিনি হতাশ। হতাশা থেকে তিনি মনে করছেন, এগুলো অর্জন করা সম্ভব না। তাই আলোচনার বদলে অশিষ্ট আক্রমণকেই তিনি বেছে নিচ্ছেন।
হতে পারে, তিনি ভারতে উচ্চতর পদে ফিরে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয় আমলাতন্ত্রের টিপিকাল ধারণাগুলোকেই তিনি জনসমক্ষে পুনরুক্ত করছেন। অথবা এসব বলে বলে তিনি বর্তমান সরকারের সহ্য ক্ষমতা পরীক্ষা করছেন। ভারতপন্থী সরকার হিসেবে যেহেতু এনাদের চুপ করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই, সেহেতু তিনি এগুলো বলে বলে সরকারের আনুগত্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন এবং সরকারকে জনগণের কাছে আরো বেশি ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
এখন প্রশ্ন হলো, পিনাকের এই অশিষ্ট কথার কারণেই কি আমরা ভারত যাওয়া বন্ধ করে দেব? ভারতীয় পণ্য ব্যবহার বন্ধ হবে? পিনাকের বক্তব্যই কি ভারতের বক্তব্য?
না পিনাকের বক্তব্যই ভারতের বক্তব্য নয়। পিনাক যে সভায় এসব আজব কথা বলেছেন সেখানেই বলা হয়েছে সহযোগিতার কথা। ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতির বিশাল অংকের কথা। ভারতের চিকিৎসা সাম্রাজ্য নিশ্চয় পিনাকের কথায় চলবে না। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়ই এখানকার মুনাফা ছাড়বে না। তাহলে? পিনাকের কথায় পরিবর্তন আনতে হবে। তাকে সংশোধন করতে হবে।
ভারতে আমাদের যেতেই হবে। কারণ সারা জাহাঁ ছে আচ্ছা হিন্দুস্তানে আমাদেরও অবদান আছে। তাজমহলে আমাদের শ্রমিকরা কাজ করেছে। মোগল দরবার আমাদের খাজনার হিস্যায় গড়ে উঠেছে। কলকাতা দিল্লি মুম্বাই গড়ে তোলায় আমাদের রক্ত শ্রম ও ঘাম আছে। আজকের ভারত তো বিনামূল্যে আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছে না। যথেষ্ট মূল্য দিয়েই আমরা চিকিৎসা কিনছি। ভারতীয় ডাল, ভারতীয় পেঁয়াজ, ভারতীয় সিনেমা, ভারতীয় সব আমরা টাকা দিয়ে কিনছি। বেচতে রাজি আর ভিসা চাইতে গেলে চোর বাটপার দালাল বলবেন সেটি তো হবে না।
এক ভারত আমাদের কাছে, সাবান বেচে। এক ভারত আমাদের নদীতে পানি আটকায়, এক ভারত আমাদের সীমান্তে গুলি করে কৃষক মারে, এক ভারত আমাদের দালাল বলে, এক ভারত দালাল পোষে, এক ভারত ব্যবসা করে, এক ভারত সীমান্তে যৌথ টহল দেয়, এক ভারত আমাদের সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য, এক ভারত আমাদের জঙ্গি বলে, এক ভারত পেঁয়াজের ব্যবসা করে, এক ভারত চালের ব্যবসা করে, এক ভারত আলোচনা করে, এক ভারত সমুদ্র দখল করে, এক ভারত ছিল আমাদেরই দেশ, এক ভারতে আমাদের আত্মীয়রা থাকে, এক ভারতে গিয়ে আর ফেরে না আমাদের মেয়েরা, এক ভারত থেকে গরু আসে, এক ভারতে আমাদের চামড়া পাচার হয়, এক ভারত অনুপ চেটিয়াকে ফেরত চায়, এক ভারত থেকে আসা ছোট অস্ত্র এসে দেশ ভরে যায়, এক ভারতে চলে যায় তালপট্টি, এক ভারত ভিসার জন্য সারাদিন বসিয়ে রাখে, এক ভারতের প্রতিনিধি পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী। সেই ভারতেরই প্রতিনিধি এপিজে আবদুল কালাম। অবাক লাগে।
সত্যিই খুব অবাক লাগে।
আমাদের নতজানু মন্ত্রীরা এইসব অনুষ্ঠানে আর কত নতজানু হয়ে থাকবেন? মাথা উঁচু করে থাকার মতো মাথা কি তাদের কোনো দিনই হবে না?
দেশে যখন টিপাইমুখ বাধ নিয়া নানান মহলে ক্ষোভ ঘনায় উঠতেছে ঠিক সেসময় পিনাকবাবু এ ধরণের মন্তব্য কইরা মনোযোগ অন্য দিকে সরানোর পায়তাড়া করতেছে- কেবলই মনে হইলো এরকম।
ReplyDelete